মৃত্যুকে ভালোবেসে আমি জীবনের কথা রেখেছি

গ্রীক মিথোলজি আর সাহিত্য নিয়ে বড় বিপদে আছি। এই সাহিত্যের কথায় কথায় মহান মহান সব বীর। ভয়াবহ তাঁদের তাণ্ডব। অসীম তাঁদের সাহস। আমার মত আম জনতার সেখানে কোন পাত্তা নেই। পাত্তা পেতে চাও, তো বীর হয়ে যাও – এই হলো গ্রিক সাহিত্যের শিক্ষা।

কয়েকদিন গ্রীক সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুর ঘুর করছে বীরদের কাহিনী। এথেন্সের রাস্তায় বের হলে শুধু মনে হয় এই বুঝি উত্তর দিক থেকে ঝুমঝুম শব্দ করে এগিয়ে এলো হারকিউলিস। গ্রিকরা অবশ্য হারকিউলিস বলে না। বলে হেরাক্লিস। হেরা দেবীর পুত্র, তাই হেরাক্লিস।

আবার ডান দিকের কালো গলিটার দিকে তাকিয়ে মনে হয় – ওখান দিয়ে আর একটু এগিয়ে গেলেই দেখা হবে একিলিসের সাথে। ট্রয়কে হারানো মস্ত বীর একিলিস। আমার চোখের দিকে তাকালেই মনের কথা বুঝে ফেলবে। জেনে যাবে – সেই ছোটবেলা থেকেই আমি একিলিসকে নয়, হেক্টরকে সাপোর্ট করি। বিরোধী শিবিরের লোক মনে করলে কী যে করবে একিলিস! বীরদের তো আবার মাথা ভীষণ গরম।
মাথা গরম হওয়ার তেমন কোন সুবিধা আছে কিনা জানি না। তবে গ্রীক বীরদের অন্য একটা সুবিধা অবশ্যই আছে। কোনমতে একবার বীর হতে পারলে, জীবনে আর কোনদিন কাপড়-চোপড় পরা লাগে না। গ্রিসের বীরদের যেখানে যত মূর্তি আছে, সবই ন্যাংটা। নগ্নতাই বীরের ভূষণ।

আমি সুযোগ পেলেই গ্রীকদের সাথে মিথোলজির এই ন্যাংটা বীরদের নিয়ে আলাপ করি। অদ্ভুত আর উদ্ভট সব কাহিনী। তবে শুধু কাল্পনিক বীরই নয়। সত্যি সত্যি বীরদেরও জন্ম হয়েছিল গ্রীসের মাটিতে। সত্যিকার রক্ত মাংসের বীরদের মধ্যে অবশ্যই শ্রেষ্ঠ লিওনিদাস। স্পার্টার রাজা লিওনিদাস।

তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি পারস্য। আজকের আমেরিকার মত। কিন্তু খ্রিস্টের জন্মের ৪৯০ বছর আগে সেই পারস্য ম্যারাথনের যুদ্ধে গ্রীকদের কাছে হেরে গেছে। অপমানের শোধ নিতে দশ বছর পর পারস্য বাহিনী আবার আসছে। এবার আসছে বিশাল বাহিনী নিয়ে। হেরোডটাসের হিসাবে এবার পারস্যের সৈন্য দুই মিলিয়নের বেশি। হতে পারে হেরোডটাস সাহেব একা একা গুনতে গিয়ে কিছু ভুল-ভাল গুনে ফেলেছে। তাই সংখ্যাটা একক দশক করে একেবারে দুই মিলিয়ন (নিযুত) হয়ে গেছে। হতে পারে এই সংখ্যাও সেই পুঁথি’র মত –
‘লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার
শুমার করিয়া দেখে সত্তর হাজার’
মিলয়ন হোক আর লাখ হোক, পারস্যের সেই বাহিনী ছিল বিশাল।

সেসময় গ্রীসের ছোট ছোট নগরগুলোতে ধনীরা কোন কাজ করতো না। তাঁদের হাজার হাজার দাস-দাসী। এই দাসরা সব কাজ করতো। আর ধনীরা বসে বসে চিন্তা করতো। চিন্তা করতে করতে এক একজন দার্শনিক হয়ে যেতো। কিন্তু শুধু চিন্তা করলে কি পুরুষালি থাকে? বীর পুরুষের তো দুইটা কাজ – প্রেম আর যুদ্ধ। কিন্তু প্রেম করা সেখানে আইন করে নিষধ করা। তাই যুদ্ধ না করে পুরুষের আর কোন অপশান নেই। তাই ছোট ছোট গ্রীক নগরের মানুষেরা সারা বছর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতো। এথেন্স, স্পার্টা, করিন্থ সব যুদ্ধবাজ জাতি। সেই সব যুদ্ধবাজদের শায়েস্তা করতে এবার পারস্যের বিশাল বাহিনী আসছে, সব নগরকে একসাথে পিষে মারবে। তাঁদের জন্য মোটামুটি ১০ নম্বর বিপদ সংকেত। মহাবিপদ টের পেয়ে বড় শত্রুর বিরুদ্ধে ছোট ছোট নগরগুলো একত্র হলো। বিপদে বন্ধু হলো গ্রীসের সবচেয়ে বড় দুই শক্তি – এথেন্স আর স্পার্টা। এই যুদ্ধে এথেন্স যুদ্ধ করবে সাগরে, তারা নৌযুদ্ধে ভালো। আর স্পার্টা যুদ্ধ করবে মাটিতে। গ্রীসের সম্মিলিত বাহিনীর সেনাপতি স্পার্টার রাজা লিওনিদাস।

লিওনিদাস গেলো ডেলফিতে। ডেলফির এপোলোর মন্দিরে ওরাকলের কাছে জিজ্ঞেস করলো যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। ওরাকলের কথা মিথ্যা হয় না। ওরাকল যা বলে, গ্রীসের সবাই সেটাই করে। ওরাকল তিনটা কথা বললো, এক- এ যুদ্ধে গ্রীসের জন্য ভয়াবহ বিপদ আসছে। দুই – সামনের পূর্ণিমাতে বিশেষ পূজা আছে, সেই পূর্ণিমার আগে স্পার্টার বাহিনী কিছুতেই যুদ্ধে যেতে পারবে না। তিন – হারকিউলিসের বংশধর কোন রাজা যদি এই যুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়, তাহলেই গ্রিস রক্ষা পাবে।

ওরাকলের প্রথম কথা সবাই জানে, এটা নতুন কিছু নয়। পারস্যের আক্রমণ একটা মহাবিপদ। দ্বিতীয় কথাটা সমস্যার। পূর্ণিমার এখনো অনেক বাকি। পারস্য বাহিনী উত্তর দিক থেকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। পূর্ণিমার আগে হয়তো তারা স্পার্টায় পৌছতে পারবে না, কিন্তু এথেন্সে পৌঁছে যাবে। পূর্ণিমার আগেই দখল করে ফেলবে এথেন্স। এথেন্স দখল করা মানেই গ্রীসের পরাজয়। কিছুতেই দেরী করা যাবে না। লিওনিদাস ভাবছেন। তাঁর মাথায় ওরাকলের তিন নম্বর কথাটা ঘুর ঘুর করছে। তিনি শুনতে পাচ্ছেন, এই যুদ্ধে গ্রিসকে বাঁচাতে হারকিউলিসের বংশধর কোন রাজাকে মরতে হবে। হঠাৎ বলে উঠলেন, আমিই তো হারকিউলিসের বংশধর। আমি মরলে যদি স্পার্টা বাঁচে, তবে তাই হোক। কিন্তু পূর্ণিমার আগে স্পার্টা বাহিনী যুদ্ধে যাবে না। এটা মহা চিন্তার কারণ। এটার জন্য কী করা যায়! অন্য কী উপায়ে পারস্যকে আটকানো যায়!

চোখ বন্ধ করে দেখছেন লিওনিদাস। কোন পথ দিয়ে শত্রু আসছে। কোথায় তাঁদের আটকানো যায়। হঠাৎ চোখ বুজে খুঁজে পেলেন তাঁর ‘ইউরেকা মোমেন্ট’। চিৎকার করে বললেন, আছে আছে, উপায় আছে। একটা ভীষণ সরু জায়গা আছে। যেখানে আটকে দিলে শত্রুরা বিশাল সৈন্য নিয়ে আগাতে পারবে না। অল্প কিছু ভালো যোদ্ধা নিয়েই দিনের পর দিন আটকে রাখা যাবে পারস্য বাহিনীকে।
-‘মাত্র তিনশ জন স্পার্টান আমার সাথে আসো। স্পার্টা বাহিনী এখন যুদ্ধে যাবে না। তারা পূর্ণিমার পরেই যাত্রা করবে। আমি শুধু তিনশজনকে নিয়ে পারস্যকে আটকে রাখব।‘
তিনশ জন সৈন্য নিয়ে লিওনিদাস পৌঁছলেন পাহাড় আর সাগরের মাঝে একটা সরু জায়গায়। জায়গাটিকে গ্রিকরা বলে থার্মোপিলাই। থার্মো মানে গরম আর পিলাই মানে গেইট বা দরজা। এই গরম দরজা ভীষণ অদ্ভুত। পৃথিবীতে এমন অদ্ভুত জায়গা খুব কম আছে। এখানে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে একটা তীব্র গরম পানির ঝরনা। ফুটন্ত গরম পানিতে সালফার মিশে তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত গ্যাস। লিওনিদাস সেই বিষাক্ত গরম পানি আটকে লেইক তৈরি করে পাহাড়ের সরু পথটা আরো সরু করে ফেললেন। আর নিজে সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনশ জন স্পার্টান নিয়ে। ততোদিনে আরো কিছু অন্য নগরের গ্রীক সৈন্য তাঁর সাথে যোগ এসেছে।

পারস্যের সম্রাট জ্রেক্সির নেতৃত্বে পারস্য বাহিনী আসলো থার্মোপিলাইতে। এতো অল্প সৈন্য দেখে তারা কিছুক্ষণ কৌতুক করলো। কিন্তু সরু পথ দিয়ে এগিয়ে আসতেই বুঝতে পারলো লিওনিদাসের যুদ্ধ কৌশল। চিকন পথ- একসাথে মাত্র কয়েকজন সৈন্য যেতে পারে, পাশেই বিষাক্ত তীব্র গরম পানি আর সামনে ভয়-ডরহীন তিনশ স্পার্টান। কয়েকজন এগিয়ে আসলেই স্পার্টান অস্ত্রের সামনে পড়ে। এমন অদ্ভুত যুদ্ধে টানা সাতদিন সেখানেই লিওনিদাস আটকে রাখলেন বিশাল পারস্য বাহিনীকে। অবশেষে এক বিশ্বাসঘাতক গ্রীক পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে অন্য একটি পথ দেখিয়ে দিলো পারস্যদের। সেখান দিয়ে গিয়ে লিওনিদাস আর তিনশ স্পার্টানকে ঘিরে ফেললো পারস্যরা। তীরের ফলায় মৃত্যু হলো লিওনিদাসের। মাত্র অল্পকিছু সৈন্যের সামনে সাতদিন দাঁড়িয়ে থেকে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল পারস্যের সম্রাট জ্রেক্সির। তাই যুদ্ধের নিয়ম নীতি ভুলে লিওনিদাসের মাথা কেটে ক্রুশবিদ্ধ করে থার্মোপিলাইতে ঝুলিয়ে রাখলো। ততোদিনে পূর্নিমা শেষ হয়েছে, স্পার্টার সৈন্যরা যুদ্ধযাত্রা করেছে। এথেন্সের বাহিনীও জাহাজ নিয়ে তৈরি পারস্যকে জবাব দিতে। শুধু লিওনিদাসের মাথাহীন দেহ ঝুলে আছে থার্মোপিলাইয়ের গরম পানির পাশে।
ওরাকলের কথা রাখলেন লিওনিদাস। গ্রীসকে জেতাতে হারকিউলিসের বংশধর রাজা আত্মাহুতি দিলেন। আর আশ্চর্যকনকভাবে সেই যুদ্ধে গ্রীকরা শেষ পর্যন্ত জিতেও গেলো। এই যুদ্ধে গ্রিকরা হারলে ইউরোপের ইতিহাস অবশ্যই অন্যরকম হতো।

এখনো গ্রিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্রান্ডের নাম লিওনিদাস। তাকে নিয়ে অনেক গল্প, কবিতা, সিনেমা হয়েছে। তাঁর মধ্যে ‘থ্রি হানড্রেড’ সিনেমাটি ভীষণ জনপ্রিয়। তরুণদের অনেকেই ৩০০ সিনেমাটি দেখেই গ্রীসের ইতিহাস জানতে শুরু করে।

গত সপ্তাহে সেই থার্মোপলিতে গিয়ে লিওনিদাসের স্মৃতি হাতড়ে হেরোডটাসের লাইনগুলো মনে এলো – ‘Oh stranger, tell the Lacedaemonians that we lie here, obedient to their words’

‘হে পথিক –
স্পার্টায় গিয়ে বলো- আজো এখানেই শুয়ে আছি
ছাড়িনি পথ –
মৃত্যুকে ভালোবেসে আমি জীবনের কথা রেখেছি’
…………………
// মৃত্যুকে ভালোবেসে আমি জীবনের কথা রেখেছি // © সুজন দেবনাথ

Must Read

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here