টাইলেস প্রধানমন্ত্রী

গ্রিসে নতুন এসেছি। ডিল্পোমেট হিসেবে কোন দেশে গেলে সে দেশের রাজা-রাজরাদের একটু খোঁজ খবর নিতে হয়। না নিলে সে দেশের রাজা মাইন্ড করবে না। কিন্তু দূতিয়ালি কাজটা ঠিকভাবে করা যায় না।
হতে চেয়েছিলাম প্রেমের দূত।
হয়ে গেলাম রাজার দূত।

কী আর করা – তাই রাজাদের একটু খোঁজ নিতে শুরু করলাম। আগের দিনের মত রাজাদের দরবার থাকলে সুবিধা হতো। যাক এখন তো রাজা নেই, রাণী নেই আছে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী। তো গ্রিসে এসে এখানের প্রেসিডেন্ট সাহেবের যে জিনিসটা সবার আগে নজরে এলো তিনি টাই পড়েন না।

গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী মিস্টার এলেক্সিস সিপ্রাস। সমাজতন্ত্রী নেতা। কথাবার্তায় অনেকটাই বিপ্লবী। আর বিপ্লবী মানেই তো এক-আধটু প্রথাবিরোধী। তো প্রথা ভাঙার ক্ষেত্রে মিস্টার সিপ্রাসের যে জিনিসটি সবার আগে চোখে পরে সেটি হলো – তিনি কখনো টাই পরেন না। একেবারে টাইলেস (Tie-less)। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের নেতাদের ফটোসেশানে রাষ্ট্রপ্রধানদের সারিতে সকল পুরুষ নেতার কলার টাইবদ্ধ। একমাত্র তাঁর কলারটাই সগর্বে খোলা। এই খোলা কলার ইউরোপীয় কূটনীতির ব্যাকরণে একেবারেই মিলে না। কিন্তু কিছু মানুষ পুরুনো ব্যাকরণ মানেন না, নতুন ব্যাকরণ তৈরি করতেই ভালোবাসেন।

আর তাই ইউরোপীয় কূটনীতির রটনা আর ঘটনায় এখন মিস্টার সিপ্রাসের টাইলেস পোশাক একটা বিশেষ কিছু। প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি ইউরোপের যেখানেই গেছেন সেখানেই তাঁর পোশাক নিয়ে ফিসফিসানি। তিনি নিজেও এটি নিয়ে মজা করেন। সবচেয়ে রসদীপ্ত মজা করেছেন তাঁর বন্ধু ইতালীর প্রধানমন্ত্রী মিস্টার মাত্তেও রেঞ্জি। মিস্টার সিপ্রাসের প্রথম ইতালী সফরের সময় রোমের সুন্দর গ্যালারিতে আলোকোজ্জ্বল সংবাদ সম্মেলনে মিস্টার রেঞ্জি গ্রীসের নেতাকে হাসতে হাসতে গিফট করলেন একটি ইতালিয়ান টাই। হয়তো ফিস ফিস করে কানে কানে বললেন, There will be a new tie between Italy and Greece. Mr. Prime Minister, certainly, it isn’t for the lack of your tie. Can you wear it?

মি. সিপ্রাসও হাসতে হাসতে উত্তর করলেন, ‘I promise I will wear it when we find finally a common viable solution for Europe. কথা দিচ্ছি – যেদিন গ্রীসের (ইউরোপের) সংকট সত্যিই সমাধান হবে, সেদিনই আমি এটি পড়ব।’
ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘Absolutely, when Greece will solve the problem of economic situation, the first tie you will wear will be an Italian tie.’ মি. সিপ্রাস বললেন, ‘ না না, যে কোন ইতালিয়ান টাই নয়, আমি তোমার এই টাইখানাই পরব।’

কবে গ্রীসের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে আর মিস্টার সিপ্রাস ওই ইতালিয়ান টাই পরবেন সেটা সময়ই বলবে। তবে ইতালীর প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর টাই-কূটনীতি ইতিহাস মনে রাখবে।

এর কয়েক মাস পরে মিস্টার সিপ্রাস গেলেন চীনে। সেখানে তিনি নিজেই করলেন টাই-ডিপ্লোমেসি। দেখলেন – আলোচনার টেবিলে চীনের প্রধানমন্ত্রী মিস্টার লি কেকিয়াংও টাই পরেননি। বুঝলেন – এটা তাঁর জন্য চীনের কূটনৈতিক ভদ্রতা।

তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, ‘I didn’t manage to export my tie-less dressing to Europe but I did to China. বাহ, আমি আমার টাইবিহীন পোশাক তো ইউরোপে পাঠাতে পারি নি – কিন্তু মনে হচ্ছে চীনে পেরেছি’। চীনের প্রধানমন্ত্রী উত্তর করলেন, ‘জিনিস ভালো হলে চীনের নিতে আপত্তি নেই।’ সত্যিই চীনারা মনে হয় ভালো জিনিস নিতে আপত্তি করে না। মিস্টার সিপ্রাসের এই চীন সফরেই এথেন্সের সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দর পিরাউসের দুই-তৃতীয়াংশ স্বত্ব কিনে নিল চীন।

নভেম্বর, ২০১৬
// টাইলেস প্রধানমন্ত্রী // ©সুজন দেবনাথ

Must Read

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here